হামে শিশু মৃত্যু: অবহেলা না অপরাধ?

লেখক: সাম্রাজ,
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে, এই মৃত্যুগুলো আইনের চোখে কিভাবে দেখা হবে—তা নিয়েও শুরু হয়েছে বিতর্ক।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গুরুতর অবহেলায় মৃত্যু ঘটলে সেটি অনেক ক্ষেত্রে “অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড” হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারা অনুযায়ী, বেপরোয়া বা দায়িত্বহীন আচরণের কারণে কারও মৃত্যু হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

আন্তর্জাতিক নজির কী বলছে

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে আদালত অতীতে গুরুতর অবহেলার কারণে মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ডে-কেয়ার সেন্টারে আগুনে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হলে আদালত সেটিকে কেবল দুর্ঘটনা নয়, বরং অপরাধমূলক দায় হিসেবে বিবেচনা করে।

যুক্তরাজ্যেও চিকিৎসায় গাফিলতির কারণে মৃত্যুকে বহু আগে থেকেই ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে।

বাংলাদেশে আদালতের অবস্থান

২০২০ সালের ১৫ জুন, বাংলাদেশের হাই কোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ আদেশে বলেন, চিকিৎসায় অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

এই রায়টি জনস্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান সংকট

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে টিকাদানে ঘাটতি বড় কারণ।
বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দীর্ঘদিন ধরে সফল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে কভারেজ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

দায় নির্ধারণে বিতর্ক

সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামের উপসর্গ নিয়ে বহু শিশুর মৃত্যু হয়েছে, এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি আইনগতভাবে দায় নির্ধারণযোগ্য অবহেলা?

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে “অপরাধমূলক অবহেলা” প্রমাণ করতে হলে দেখাতে হবে—
• ঝুঁকির বিষয়টি জানা ছিল
• তবুও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি
• এবং সেই অবহেলার সরাসরি ফলে মৃত্যু ঘটেছে

মানবিক দিক

এই সংখ্যার পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবার, যারা তাদের সন্তান হারিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যু একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন জরুরি কয়েকটি পদক্ষেপ

• টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা
• হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো
• এবং সম্ভাব্য অবহেলার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা

একই সঙ্গে, আইনগত কাঠামোর আলোকে দায় নির্ধারণ করা হলে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।