১০ মাস ধরে কারাবন্দী নাসরিন: গুরুতর অসুস্থতা ও অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ

লেখক: সুবির দে,
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

দিনপত্র ডেস্ক :: যুব মহিলা লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ইসরাত জাহান নাসরিন ১০ মাস ধরে বন্দী। কারাগারে অমানুষিক নির্যাতন ও সুচিকিৎসার অভাবে প্রাণহানির শঙ্কায় স্বজনরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাজবন্দীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এই ধারায় সবশেষ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যুব মহিলা লীগের সাবেক সহ-সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের রাজপথের পরিচিত মুখ ইসরাত জাহান নাসরিনকে নিয়ে। গত ১০ মাস ধরে কারাবন্দী এই নেত্রীর শারীরিক অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে দাবি করেছেন তার পরিবার ও স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, কারাগারে তাকে যথাযথ চিকিৎসা না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

বিপ্লব পরবর্তী প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং সরকার পরিবর্তনের পর যখন আওয়ামী লীগের অনেক শীর্ষ নেতা আত্মগোপনে চলে যান, তখন রাজপথে মুজিবীয় আদর্শের ঝাণ্ডা হাতে সরব ছিলেন ইসরাত জাহান নাসরিন।

ক্রমাগত কর্মসূচি: ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে ‘অবৈধ দখলদার’ আখ্যা দিয়ে অসংখ্য মিছিল ও প্রতিবাদী কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি।

২১ অক্টোবর ২০২৪: বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে হওয়া প্রথম মিছিলে তিনি সক্রিয় নেতৃত্ব দেন।

১৮ নভেম্বর ২০২৪: ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া ঝটিকা মিছিলে তাকে সম্মুখ সারিতে দেখা যায়।

গ্রেপ্তার ও কারান্তরীণ জীবন
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

স্বজনদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পর থেকেই তার ওপর শুরু হয় রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। একটি মামলায় আদালত থেকে জামিন পেলেও মুক্তি মেলেনি তার।

জেলগেট থেকে বারবার নতুন নতুন গায়েবি ও মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে ১০ মাস ধরে বন্দী রাখা হয়েছে।

অমানুষিক নির্যাতন ও বারবার জেল বদল
নাসরিনের পরিবারের দাবি, কারাগারে তার ওপর মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানুষিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে।

গত ১০ মাসে তাকে দফায় দফায় এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জ থেকে কাশিমপুর, সেখান থেকে সিলেট, সিলেট থেকে নারায়ণগঞ্জ এবং পুনরায় সিলেটে—এভাবে বারবার কারাগার পরিবর্তনের মাধ্যমে তাকে চরম মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করা হয়েছে।

কারাগারে সুচিকিৎসা ও খাদ্যের অভাব: স্বজনদের উদ্বেগ
নাসরিনের স্বজনরা অতি সম্প্রতি তার সাথে সাক্ষাতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অভিযোগ করেছেন যে:

১. শীতকালীন বস্ত্রের অভাব: হাড়কাঁপানো এই শীতে তাকে পর্যাপ্ত গরম কাপড় দেওয়া হয়নি।

২. খাদ্য ও পানি: তাকে সময়মতো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি দেওয়া হচ্ছে না।

৩. সুচিকিৎসার অভাব: কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরও কারা কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে নিচ্ছে না।

৪. স্লো পয়েন্টজনিংয়ের অভিযোগ: পরিবারের সদস্যদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, কারাগারে অত্যন্ত গোপনীয়তায় তাকে ‘স্লো পয়জনিং’ বা ধীর বিষক্রিয়ার মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা চলছে।

পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের আল্টিমেটাম
নাসরিনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তার ভাই-বোন এবং আত্মীয়রা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তারা দাবি করেছেন, যদি অবিলম্বে নাসরিনকে মুক্তি দেওয়া না হয় বা উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা না হয়, তবে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য সরকার ও কারা প্রশাসন দায়ী থাকবে।

একই সাথে তারা সকল রাজবন্দীর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও মানবাধিকার
বাংলাদেশে রাজনৈতিক বন্দীদের ওপর নির্যাতন ও বিচারহীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের কর্মীদের ওপর ঢালাও মামলা ও সুচিকিৎসার অভাব নিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনেও আলোকপাত করা হয়েছে।

উপসংহার
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে কাউকে বিনা বিচারে বা বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া আইনের শাসনের পরিপন্থী।

ইসরাত জাহান নাসরিনের পরিবার ও আওয়ামী লীগের তৃণমূল কর্মীরা তার দ্রুত মুক্তির দাবিতে সোচ্চার।

সরকারের উচিত অবিলম্বে এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে নাসরিনের মানবাধিকার রক্ষা করা।

অন্যথায়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের যে অভিযোগ উঠেছে, তা দেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে আরও ক্ষুণ্ণ করবে।