দিনপত্র ডেস্ক :: (তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের প্রধানরা জানিয়েছিলেন, দুইজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার হত্যাকাণ্ড বাড়ানোর সঙ্গে জড়িত।)
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিনগুলোতে বিদেশে থাকা একটি বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা কমপক্ষে দুইজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে (যারা ওই দলের সঙ্গে যুক্ত) নির্দেশ দেন যে “আরও লাশ ফেলার প্রয়োজন”। ডিজিএফআই ও এনএসআই প্রধানরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালকে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়ে রাখেন। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল দেশে সহিংসতার মাত্রা বাড়ানো।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক এবং এনএসআই প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসাইন আল মোরশেদ কামাল ও আওয়ামী লীগ সরকারের আইনশৃঙ্খলা কমিটিকে ব্রিফ করেন। তারা বলেন, ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানোর একটি ষড়যন্ত্র হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো।
দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার নাম – ব্রিগেডিয়ার (অব.) জগলুল আহমেদ এবং মেজর (অব.) ফেরদৌস – যাদের হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করতে বলা হয়েছিল, সেই নাম কামালকে জানানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয় যে, ব্রিগেডিয়ার (অব.) ফেরদৌস, বরখাস্তকৃত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুরের সঙ্গে এই কাজ করার জন্য ষড়যন্ত্র করেছে। গোয়েন্দা প্রধানরা আরও জানান যে, দুষ্কৃতকারী সামরিক কর্মকর্তা, বরখাস্ত সেনাসদস্য, বিদেশি ভাড়াটে বাহিনী ও ভাড়া করা খুনিরা সমন্বয় করে “আরও লাশ ফেলার” পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
কামালকে মার্কিন দূতাবাসের কূটনীতিকদের সরাসরি জড়িত থাকার কথা এবং বিশেষ করে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গুইন লুইসের অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনায় জড়িত থাকার কথাও জানানো হয়। যদিও মাত্র চার-ছয়জন শিক্ষার্থীকে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছিল, ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্টের মধ্যে যারা মারা যান তাদের অধিকাংশ ছিলেন সাধারণ পথচারী, দিনমজুর, দোকানকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষী।
অজ্ঞাত দূরপাল্লার স্নাইপারদের মূল লক্ষ্য ছিল এই হত্যাকাণ্ডের দায় শেখ হাসিনা ও পুলিশের ওপর চাপানো, যাতে তরুণরা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপে যায়। আর তারা এই লক্ষ্য সফল হয়েছে। অ-সরকারি গোষ্ঠীগুলোর এই সশস্ত্র অস্থিরতা আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও সমর্থন পায়।
আর সেনাবাহিনী!? তারা রাষ্ট্রের একটি প্রধান স্তম্ভ; তারা সরকার ও দেশের জনগণ, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার বদলে এই ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীগুলোকে সুরক্ষা দিয়েছে।২০২৪ সালের ৮ আগস্টের পর সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত উধাও হয়ে যাওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বড় কোনো অভিযান চালায়নি।
কার্যত, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি “নীরব অভ্যুত্থান” শুরু হয়। ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থনকারী সামরিক কর্মকর্তারা নিয়ন্ত্রণ নিতে চান এবং ৫ আগস্টের মধ্যে একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটে। অতঃপর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নিজের পদে থাকলেও কর্তৃত্ব চলে যায় “বিশ্বাসঘাতক” কর্মকর্তাদের একটি দলের হাতে।
এই অভ্যন্তরীণ সামরিক পরিবর্তনকে শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলা হচ্ছে। নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বড় ভূমিকা রাখেন।
গত দশক ধরে সেনাবাহিনীর ভেতরে ক্যাডেট কলেজ আর অ-ক্যাডেট কলেজ পড়ুয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বিভেদ তৈরি হয়েছে। এই বিভেদ তখন গুরুত্ব পায় যখন তিন “পুরনো ক্যাডেট”– জেনারেল ওয়াকার, অ্যাডমিরাল নাজমুল ও এয়ার চিফ মার্শাল হাসান – নেতৃত্বে আসেন।
তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় সামরিক মহলে তাদের “ডিপ স্টেট” বা গভীর রাষ্ট্র বলে ডাকা হতো। অ্যাডমিরাল নাজমুলের প্রভাব জেনারেল ওয়াকার ও এয়ার মার্শাল হাসানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে। আর সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকের ধারণা রাজনৈতিক নেতারা অযোগ্য, অশিক্ষিত। আর সামরিক কর্মকর্তারাই রাষ্ট্র চালাতে বেশি সক্ষম। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে অন্তত চারবার উচ্চাকাঙ্ক্ষী সামরিক কর্মকর্তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে।
রেজিম চেঞ্জ অপারেশনের শেষ ধাপটি শুরু হয় যখন অ্যাডমিরাল নাজমুল হাসানকে ২০২৩ সালের ২৪ জুলাই নৌবাহিনী প্রধান করা হয়। তিনি মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেন। আমেরিকার নৌবাহিনীর একটি শাখা গত দশকে বাংলাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ দিয়েছে, যার মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের সমতা প্রকল্প ও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।
আমেরিকার নৌবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চায়!
শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনা ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পিছিয়ে যায়। কারণ তখন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউদ্দিন আহমদের মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানো হয়। তারপর পরিকল্পনার সময় ধরা হয় ভারতের সাধারণ নির্বাচনের পর জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ। এজন্য সক্রিয় ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মীদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়, যাতে ছিলেন অ্যাডমিরাল নাজমুল, ডিজিএফআইয়ের হামিদুল হক, এনএসআইয়ের টি এম জোবায়ের ও আরও অনেকে। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিকীর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ঢাকায় নিয়মিত বৈঠক হতো, যার মধ্যে রাওয়া ক্লাব উল্লেখযোগ্য। জামায়াতের এক দণ্ডিত নেতার আত্মীয় একজন সামরিক কর্মকর্তা এই নেটওয়ার্কের কিছু অংশ সমন্বয় করতেন।
ভারতের ১৮তম লোকসভা নির্বাচন ১৯ এপ্রিল থেকে ১ জুন ২০২৪ পর্যন্ত হয়, ফল আসে ৪ জুন। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়।
জেনারেল ওয়াকার ২৩ জুন ২০২৪-এ সেনাপ্রধান হন, যখন জেনারেল শফিউদ্দিন অবসর নেন। জেনারেল ওয়াকারের মতামত নিয়ে অ্যাডমিরাল নাজমুল ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়ার মতো বড় কর্মকর্তারা কৌশল তৈরি করেন।
এর আগে ২০০৭ সালে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দ্রুত রাজনৈতিক ঘটনাবলিতে – যেমন নতুন দল তৈরি এবং নোবেলজয়ী ইউনূসের জড়িত থাকা – একই রকম বাইরের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
আগস্ট ৫, ২০২৪-এ শেখ হাসিনা সরকারের পতনে বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের জড়িত থাকার প্রমাণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আছে। তৎকালীন ডিজিএফআই প্রধান হামিদুল হকের তত্ত্বাবধানে সক্রিয়, বরখাস্ত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বিদেশি বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ঢাকার ভূগর্ভস্থ “সেভেন স্টার” গোষ্ঠীর সদস্যরা মিলে সহিংসতা চালায়।
ব্রিগেডিয়ার রফিকের আর্টিলারি গ্রুপ ও বিজিবি প্রধান মেজর জেনারেল আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী সরঞ্জাম দেয়। নাশকতার প্রমাণ থাকলেও এনএসআই প্রধান মোরশেদ ব্যবস্থা নেননি বা সরকারকে জানাননি।
৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কৌশলগতভাবে ১৫ মাসের জন্য জামায়াতে ইসলামী দখল করে নেয়। আর সামরিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ জামায়াতের প্রভাবে চলে যায়। যেখানে আমেরিকা, পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা ঘনঘন আসতেন। সেসময় বেশ কয়েকটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, যার অনেকগুলোর শিকার হন আওয়ামী লীগের কর্মীরা।
অনেক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা – যাদের কেউ আগে শাস্তি পেয়েছিলেন বা বরখাস্ত হয়েছিলেন – প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকার উৎখাতে ভূমিকা রেখেছেন। এদের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে যোগসূত্র থাকার কথা বলা হচ্ছে, সেই সঙ্গে ভারতীয় ও রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিলো।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর এই “নীরব অভ্যুত্থানের” সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লাভবান হচ্ছে বিএনপি। প্রশ্ন জাগে যে কেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যেমন ইকবাল করিম ভূঁইয়া ও হাসান সোহরাওয়ার্দী সরকারের পতন সমর্থন করলেন!?
কিন্তু মেজর জেনারেল (অব.) মোমেন, ব্রিগেডিয়ার (অব.) জগলুল আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার (অব.) ফজল, মেজর (অব.) ফেরদৌস, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জুলফিকার, বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাছিনুর রহমান, বরখাস্ত মেজর জিয়া ও বরখাস্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ – এদের আগে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে শাস্তি বা বরখাস্ত করা হয়েছিল। এদের মধ্যে হাসিনুর, জিয়া ও তারেক সাঈদ বড় অপরাধে দণ্ডিত হয়েছিলেন। আর তারাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে “অ-সরকারি অভিনেতা” হিসেবে কাজ করেন এবং শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতে “সশস্ত্র” ভূমিকা রাখেন। এই কর্মকর্তাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগসূত্র থাকার পাশাপাশি ভারতীয়, রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গেও সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে তারা জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া এবং এসএসএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন।
আর মজার ব্যাপার হলো, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফজল বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাজ করছেন এবং তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনী “পরিকল্পনা” বাস্তবায়ন করেছিলেন। (চলবে)
(লেখক একজন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক)