প্রতিহিংসার আগুনে পুড়েছিল গাজী টায়ারস, এখনো নিখোঁজ ১৮২ শ্রমিক

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: গত বছর ২৫ আগস্টের সকালটা ছিল রূপগঞ্জের গাজী টাইরস কারখানার শ্রমিকদের কাছে আরেকটা সাধারণ কর্মদিবস। কেউ মেশিনে ব্যস্ত, কেউ প্যাকেজিংয়ে, কেউবা ডেলিভারির প্রস্তুতিতে। কিন্তু দুপুরের পর হঠাৎ করেই সেই স্বাভাবিক দিনটি রূপ নেয় মৃত্যুফাঁদে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তের মধ্যে গ্রাস করে নেয় পুরো ভবনটিকে। কালো ধোঁয়ার ভেতর থেকে ভেসে আসে সাহায্যের আর্তনাদ, তারপর নেমে আসে দীর্ঘ নীরবতা।

এক বছর পেরিয়ে গেছে। আগুনের ধ্বংসস্তূপ আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে সেই সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে শোকাহত পরিবারগুলো, যাদের প্রিয়জন ১৮২ জন শ্রমিক এখনও নিখোঁজ। পোড়া দেয়ালে ধোঁয়ার গন্ধ মিলিয়ে গেলেও, তাদের জীবনে সেই আগুনের দগদগে ক্ষত এখনো অমলিন।

“আমরা এখন দেহও চাই না, শুধু একটা কবর চাই,” বলেন করিমা বেগম, যাঁর ছেলে মিজানুর ওই দিন প্যাকেজিং ইউনিটে কাজ করছিলেন। “প্রথমে ভাবছিলাম, হয়তো ও বেঁচে গেছে। পরে আশা ছিল অন্তত লাশটা পাবো। এখন শুধু চাই নামটা একটা কবরে লেখা থাকুক।”

সরকার দ্রুতই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। প্রতিশ্রুতি এসেছিল দোষীরা ধরা পড়বে, কারণ প্রকাশ হবে। কিন্তু এক বছর কেটে গেলেও সেই তদন্ত প্রতিবেদন এখনো অদৃশ্য। পরিবারগুলো ঘুরছে প্রশাসনের দোরে দোরে, কেউ হাতে শ্রমিক পরিচয়পত্র, কেউ বুকের মাঝে ছোট্ট ছবি নিয়ে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ভবনের ভেতরে রাসায়নিক পদার্থ থাকায় উদ্ধারকাজ ছিল ভয়াবহভাবে বিপজ্জনক। দমকল কর্মীদের কেউ কেউ বলেছিলেন, “এটা আগুন নেভানো নয়, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই।”

নিখোঁজদের পরিবারের দাবি, এই আগুন ছিল কোনো দুর্ঘটনা নয় বরং একটি পরিকল্পিত প্রতিহিংসা। গাজী টাইরস ছিল দেশের সফল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সেই সাফল্য ধ্বংসের উদ্দেশ্যেই আগুন লাগানো হয়েছিল বলে তাদের বিশ্বাস।

“আমাদের সন্তানদের পুড়িয়ে মারা হলো, অথচ কেউ বিচার পেল না,” ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে বলেন করিমা বেগম। “যারা এই আগুনের পেছনে ষড়যন্ত্র করেছে, তাদের বিচার চাই। আমরা শান্তি চাই, কিন্তু সেই শান্তি আসবে ন্যায়ের মাধ্যমেই।”

রূপগঞ্জের সেই পোড়া ভবনের চারপাশে এখন ঘাস গজিয়েছে, কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাতাসে ভেসে আসে হাহাকারের প্রতিধ্বনি। লাইলি আক্তার, নিখোঁজ শ্রমিক রুবেল মিয়ার স্ত্রী, কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলেন, “আমাদের শুধু শান্তি দরকার। যারা বেঁচে নেই, তাদের যেন অন্তত মাটির নিচে শান্তি দেওয়া হয়।”

এক বছর পরও রূপগঞ্জের গাজী টায়ারসের আগুন নিভে গেছে শুধু বাইরে, ভেতরে নয়। এখনো জ্বলছে ১৮২টি পরিবারের বুকের আগুন প্রতিহিংসার শিকার সেই শ্রমিকদের স্মৃতিতে, আর অপূর্ণ ন্যায়ের অপেক্ষায়।