রেডিসনে গোয়েন্দা বৈঠক: চিকেন’স নেক ও দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ছক,

লেখক: প্রফেসর ড. আরিফ খান
প্রকাশ: ৯ ঘন্টা আগে

দিনপত্র ডেস্ক :: ঢাকার রেডিসনে আইএসআই-ডিজিএফআই গোপন বৈঠক। চিকেন’স নেক ও সেভেন সিস্টার্স নিয়ে নয়া ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। ভারত কি কৌশলী ফাঁদে?

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক;
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির আকাশে এক অস্থির পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কূটনৈতিক পাড়ায় গুঞ্জন, সম্প্রতি ঢাকার অভিজাত হোটেল রেডিসন ব্লু-তে এক অত্যন্ত গোপনীয় রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সংস্থা (ISI) এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (DGFI) ও এনএসআই (NSI)-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, এই বৈঠকের মূল এজেন্ডা ছিল ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেন’স নেক’ (Chicken’s Neck) সহ পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ সংক্রান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান। এই ঘটনা প্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই অঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তা বলয় ভাঙতে এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সম্পদগুলোকে শক্তিশালী করতে এক বিশাল আন্তর্জাতিক অক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

তুরস্ক-পাকিস্তান লবি এবং তারেক রহমানের নয়া কৌশল
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি এখন সরাসরি পাকিস্তান ও তুরস্ক লবির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। তুরস্কের সাথে বর্তমানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় পরাশক্তির সুসম্পর্ক থাকায় এই লবিটি তারেক রহমানের জন্য এক শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ‘কৌশলগত সমঝোতা’ (Strategic Truce)-এর ক্ষেত্রে এই তুরস্ক-পাকিস্তান অক্ষ এক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউ-টার্ন’ এবং মিয়ানমার সমীকরণ
মিয়ানমারের বিরল খনিজ পদার্থ (Rare Earth Materials) নিয়ন্ত্রণে রাখার মার্কিন কৌশল যখন ব্যর্থতার মুখে, তখনই ওয়াশিংটন তাদের নীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তন এনেছে। এখন তারা তুরস্ক-চীন-পাকিস্তান রুট ব্যবহার করে এই অঞ্চলে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। ভারত একসময় ‘কোয়াড’ (QUAD)-এ অতি-সক্রিয় হয়ে চীনের সাথে দূরত্ব তৈরি করেছিল, যা দিল্লির জন্য একটি কৌশলগত ভুল হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থের প্রয়োজনে এখন ভারতের পিঠে এক ধরণের ‘কূটনৈতিক ছুরি’ মেরে চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক অক্ষের সাথে সমঝোতা করে ফেলেছে। ভারতকে এখন মূলত বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তাদের স্বার্থ হাসিলের টার্গেট বানানো হয়েছে।

বাইপোলার বিশ্ব বনাম মাল্টিপোলার ভারত-রাশিয়া
মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য খর্ব হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র এখন ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমেরু বিশিষ্ট পৃথিবী ঠেকাতে মরিয়া।

তারা চায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি ‘বাইপোলার’ বা দ্বিমেরু বিশিষ্ট বিশ্ব ব্যবস্থা বজায় রাখতে।

এই লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যৌথভাবে ভারতকে দমিয়ে রাখার একটি অলিখিত চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তিস্তা ও বেল্ট রোড: চীনকে এই অঞ্চলে তিস্তা প্রকল্প এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর সুযোগ দিয়ে আমেরিকা আপাততের জন্য বেইজিংয়ের সাথে একটি কৌশলগত সমঝোতা করেছে।
টার্গেট বাংলাদেশ: এই বিশাল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা বাংলাদেশকে একটি প্রধান ‘বেস’ বা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা সাজিয়েছে।

জ্বালানি বাজারের নয়া মেরুকরণ ও ওপেক (OPEC)
বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনীতির আরেকটি বড় হাতিয়ার হলো জ্বালানি বাজার।

আগে ওপেক জ্বালানি তেলের বাজারের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত, কিন্তু বর্তমানে তা ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এর ফলে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এখন তাদের নিজস্ব দামে তেল বিক্রি করতে পারবে, যা আমেরিকার বিশ্বব্যাপী তেল বাজারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে চরমভাবে সীমাবদ্ধ করে দিবে।

তাইওয়ান ও সেমিকন্ডাক্টর: কেন চীনের সাথে আমেরিকার এই সমঝোতা?
চীনের সাথে আমেরিকার বর্তমান সমঝোতার অন্যতম কারণ হলো তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি।

আমেরিকা এই শিল্পের যন্ত্রাংশ এবং ইন্ডাস্ট্রি সরিয়ে নিতে আরও ৬ থেকে ৭ বছর সময় প্রয়োজন বলে মনে করছে।

যেহেতু বর্তমানে আমেরিকার অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে রয়েছে, তাই চীনের সাথে সরাসরি দ্বন্দ্বে জড়ানো তাদের জন্য বিপদজনক হবে।

এই সময়টা পাওয়ার জন্যই তারা চীনের সাথে একটি নীতিগত সমঝোতায় থাকা শ্রেয় মনে করছে।

আরআইসি (RIC): ভারতের বাঁচার শেষ পথ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতকে এখন ‘কোয়াড’ থেকে সরে এসে আরআইসি (RIC – রাশিয়া, ভারত, চীন) জোটকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

যদি ভারত চীন ও রাশিয়ার সাথে পুনরায় সখ্যতা তৈরি করতে পারে, তবেই আমেরিকা ও চীনের এই গোপন সমঝোতাকে দুর্বল করা সম্ভব। এটি করা গেলে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের কালোবাজারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তুরস্ক ও পাকিস্তানের ‘সন্ত্রাসবাদী ব্যবসা’ দুর্বল হয়ে পড়বে।

চিকেন’স নেক ও সেভেন সিস্টার্স: নিরাপত্তা ঝুঁকি
রেডিসনের বৈঠকে শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা ভারতের জন্য চরম উদ্বেগের।

মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ রক্ষা করে।

পাকিস্তানি গোয়েন্দা সম্পদের (Intelligence Assets) এই অঞ্চলে সক্রিয়তা এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে তথ্য শেয়ারিং ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও আসামের মতো রাজ্যগুলোতে প্রভাব বিস্তারের নয়া ছক আঁকা হচ্ছে।

এক জটিল ভবিষ্যতের হাতছানি
দক্ষিণ এশিয়া এখন এক বিশাল দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে।

যেখানে পরাশক্তিরা তাদের নিজস্ব স্বার্থে ভারতকে কোণঠাসা করার জন্য পুরনো শত্রুতা ভুলে হাত মেলাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা তৎপরতা দিল্লির জন্য অশনি সংকেত।

ভারত যদি দ্রুত তার ‘আরআইসি’ নীতিতে ফিরে না আসে, তবে সামনের দিনগুলোতে এই অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ঢাকার সেই গোপন বৈঠক কেবল একটি আলোচনা ছিল না, এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এক শক্তিশালী নীল নকশা।