নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। উৎপাদন, সেবা ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস এই খাত আজ অভূতপূর্ব স্থবিরতার মধ্যে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক কঠোর মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদহার নীতি এই স্থবিরতার মূল কারণ, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
*ঋণ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ধারায়*
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের আগস্টে কমে দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৪৭ হাজার ৯৪ কোটি টাকায়।
অর্থাৎ, নতুন ঋণ বিতরণ না হয়ে বরং বিদ্যমান ঋণের পরিমাণই কমে গেছে যা ব্যাংকিং খাতের জন্য এক অশনিসংকেত।
*অবৈধ সরকারের নীতিতে কঠোরতার চাবুক*
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর এইচ. মনসুর দায়িত্ব নিয়ে উচ্চ সুদহার ও সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির পথ বেছে নেন।
লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু বাস্তবে এই নীতিই হয়ে উঠেছে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাধা।
নীতি সুদহার (রেপো রেট) ধাপে ধাপে ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়, ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে সুদবৃদ্ধির এই প্রভাব জনগণ বা উদ্যোক্তা কেউই ইতিবাচকভাবে পাচ্ছেন না। বরং বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা নতুন ঋণ নিচ্ছেন না, আর শিল্প সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলো থেমে আছে।
ব্যাংকগুলোর নিরাপদ আশ্রয় এখন সরকারি বন্ড
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন,
বেশির ভাগ ব্যাংক এখন নতুন ঋণ না দিয়ে সরকারি বিল–বন্ডে বিনিয়োগ করছে। কারণ এই বিনিয়োগ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত। গত দুই বছর মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন করে ঋণ বিতরণ করছে না।”
তিনি আরও বলেন,
গত দেড় দশকের উচ্চ ঋণ প্রবৃদ্ধির বড় অংশই ছিল অনিয়ম ও জালিয়াতির ফল। এখন সেই ব্যাংকগুলো কার্যত পঙ্গু; অনেক ব্যাংক একীভূত হওয়ার পথে। ফলে নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা নেই।”
ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল এখন উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে সরকারি ঋণপত্রে আটকে পড়ছে, যা অর্থনীতির গতি রোধ করছে।
*ঋণপ্রবাহে খরা, কর্মসংস্থানে ধস*
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) তাদের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলেছে,
বেসরকারি খাতের বর্তমান ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন। উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতির কারণে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছেন।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার আরও কমবে, আর বিদ্যমান শিল্প ও সেবা খাতও সংকটে পড়বে। কারণ বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশের বেশি নির্ভরশীল বেসরকারি খাতের ওপর।
অবৈধ সরকারের নীতির কঠোরতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনমনীয় সুদহার নীতি এখন অর্থনীতিকে এক চক্রবদ্ধ স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট, উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহ, এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মিশ্রণে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে উঠেছে।
যদি দ্রুত নীতিগত সমন্বয় না আনা হয় বিশেষত সুদহার কমিয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও শিল্প খাতে ঋণপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ না নেওয়া হয়—তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এক অচল চক্রে বন্দী হয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।