মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তি: জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা কি হুমকির মুখে?

লেখক: সুমিত্রা দেবী,
প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

দিনপত্র ডেস্ক :: গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট’ বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে এবং জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তড়িঘড়ি করে সই হওয়া এই চুক্তিটিকে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য “বিপজ্জনক” বলে অভিহিত করছেন বিশ্লেষকরা।
​বাণিজ্যের আড়ালে কৌশলী নিয়ন্ত্রণ?
​লোটাস সেন্টার ফর ডায়ালগের গবেষক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে এই চুক্তিটিকে সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেন মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণী ক্ষমতা খর্ব করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। শুল্ক কমানো বা বাজার সুবিধা বাড়ানোর মোড়কে এই চুক্তি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণমূলক ক্ষমতা, ডিজিটাল শাসন ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত নমনীয়তাকে সংকুচিত করছে।
​পারমাণবিক শক্তিতে মার্কিন হস্তক্ষেপের শর্ত
​চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অনুচ্ছেদ ৪.৩(৫)-কে। এই শর্ত অনুযায়ী:
​বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “অপরিহার্য স্বার্থ” ক্ষুণ্ণ করে।
​জ্বালানি নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের চেয়ে মার্কিন অগ্রাধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
​বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সরাসরি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি অবকাঠামো এবং কৌশলগত ক্রয়ক্ষমতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।
​”একটি বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে একটি দেশের সার্বভৌম জ্বালানি নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা নজিরবিহীন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে মার্কিন কৌশলগত পছন্দগুলোকে গেঁথে দেওয়া হয়েছে।” — ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক
​তৃতীয় দেশের সাথে সম্পর্কের ওপর প্রভাব
​ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ বর্তমানে বিভিন্ন পরাশক্তির টানাপোড়েনের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ তার ‘কৌশলগত নমনীয়তা’ (Strategic Flexibility) হারাতে পারে। চুক্তির বেশ কিছু ধারা এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা ভবিষ্যতে তৃতীয় কোনো দেশের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দরকষাকষির পথ রুদ্ধ করে দেবে।
​জবাবদিহিতার দাবি
​চুক্তিটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে যে, কেন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের মেয়াদের একেবারে শেষ পর্যায়ে এত বড় একটি দীর্ঘমেয়াদী সিদ্ধান্ত নিল। সমালোচকদের দাবি:
​যারা এই চুক্তির আলোচনা ও স্বাক্ষরের নেপথ্যে ছিলেন, তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
​জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে কেন বিষয়টিকে গোপন রাখা হলো বা দ্রুত শেষ করা হলো, তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
​সামান্য বাণিজ্যিক সুবিধার বিনিময়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

​উপসংহার: এই চুক্তিটি কেবল একটি বাণিজ্যিক দলিল নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত অসম চুক্তি হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদী কিছু বাণিজ্যিক লাভের আশায় বাংলাদেশ তার দীর্ঘমেয়াদী নীতি নির্ধারণী স্বাধীনতা বা ‘লিভারেজ’ হারিয়ে ফেলছে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।