২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন: সেনা ও গোয়েন্দা সংশ্লিষ্টতা

লেখক: সুমিত রায়,
প্রকাশ: ৪ দিন আগে

নিউজ ডেস্ক
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘিরে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সদস্যের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই পরিবর্তন ছিল আকস্মিক নয়; বরং এর পেছনে পরিকল্পিত তৎপরতা থাকতে পারে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

৫ আগস্টের সকাল: সমাবেশ ও অগ্রযাত্রা

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওইদিন সকালে ঢাকার মিরপুর ও মহাখালীর ডিওএইচএস এলাকায় অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের কয়েকটি দল জড়ো হন। পরে তারা ছোট ছোট মিছিল আকারে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট—ইসিবি স্কয়ার, জাহাঙ্গীর গেট ও বনানীর দিকে অগ্রসর হন।

প্রত্যেক দলে ৪০ থেকে ৫০ জনের মতো অংশগ্রহণকারী ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মিছিলগুলোতে “সামরিক সরকার চাই” ধরনের স্লোগান দেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।

এই সময় এক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফোন করে সতর্ক করেন যে তিনি ‘স্নাইপার জোনে’ প্রবেশ করেছেন—এমন দাবি প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

‘স্নাইপার’ আতঙ্ক ও সতর্কবার্তা

ঘটনার আগে ও চলাকালে ‘স্নাইপার’ উপস্থিতির বিষয়ে একাধিক ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। একজন সাবেক উপদেষ্টা বলেন, ৫ আগস্টের প্রায় এক সপ্তাহ আগে একজন সেনা কর্মকর্তা তাকে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্নাইপার মোতায়েনের বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।

তবে এসব তথ্যের কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

কোটা আন্দোলন: পটভূমি ও বিস্তার

২০২৪ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রথমে এটি শিক্ষার্থীদের দাবিভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও, পরে তা দ্রুত বিস্তৃত হয়।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনের ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীরা সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে একটি ছাত্র সংগঠনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সহিংসতার মোড় ও মৃত্যুর ঘটনা

১৬ জুলাই রংপুরে এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। এরপর জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশজুড়ে সহিংসতা বাড়তে থাকে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময় শতাধিক মানুষ নিহত হন, যাদের অনেকেই দূরপাল্লার গুলিতে মারা যান বলে দাবি করা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগের শরীরে মাথায় গুলির আঘাত ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে পেছন দিক থেকে গুলি করা হয়েছিল—এমন অভিযোগও তোলা হয়েছে।

তবে এসব ঘটনার দায় কার ওপর বর্তায়, তা স্পষ্ট নয় এবং আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্ন

ঘটনার সময় ঢাকায় কারফিউ জারি ছিল এবং শহরের প্রবেশপথে সেনা মোতায়েন ছিল। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরা এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত এক সেনা কর্মকর্তা মাইকে ঘোষণা দেন যে কারফিউ নেই এবং লোকজন ঢাকায় প্রবেশ করতে পারে। এতে প্রথমে বিভ্রান্তি তৈরি হলেও পরে জনতা রাজধানীতে ঢুকে পড়ে।

রাজনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগের অভিযোগ

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই সময় কিছু সামরিক কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। এমনকি বিদেশি কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও তোলা হয়েছে।

এছাড়া, ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার কিছু কর্মকর্তার যোগাযোগ ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে নিরপেক্ষ প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ইউনিটকে রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে অভিযোগ করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিটগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি।

এই নিষ্ক্রিয়তা ইচ্ছাকৃত ছিল কি না—সে প্রশ্নও তোলা হয়েছে প্রতিবেদনে।

তদন্তের অভাব ও বিতর্ক

প্রতিবেদনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এসব ঘটনার পরও কোনো বিস্তৃত ও নিরপেক্ষ তদন্তের উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এত গুরুতর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কোনো অংশ রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা স্পষ্ট না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনটিতে উত্থাপিত বিষয়গুলো এখনো প্রমাণিত নয় এবং সংশ্লিষ্ট অনেক পক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তবে এই অভিযোগগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।