অনলাইন ডেস্ক :: প্রিয় সহকর্মী ও আমার প্রাণপ্রিয় পুলিশ কনস্টেবল ভাইয়েরা,
আসসালামু আলাইকুম।
আজ আপনাদের উদ্দেশে এই চিঠি লিখছি—একজন সহযোদ্ধা, একজন আপনজন, একজন আপনাদের মতোই বুকে বাংলাদেশ ধারণ করা পুলিশের সদস্য হিসেবে। হৃদয়ের গভীর থেকে কিছু কথা বলার জন্যই আজ এই চিঠি।
আমি জানি, আমরা অনেক কিছু সহ্য করেছি। দুর্বৃত্তের বুলেটে ঝরে গেছে অসংখ্য জীবন, আগুনে পুড়েছে স্বপ্ন, আহত হয়েছে অগণিত সহকর্মী। সেই শহিদ সহকর্মীদের পরিবার আজও কষ্টে দিন কাটায়—কেউ খোঁজ রাখে না, কারো চোখে জলও পড়ে না। আমরা রক্ত দিয়েছি, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছি অবহেলা আর অন্যায়।
আজও দেখি—আমাদের আইজিপি, যিনি আমারই ব্যাচমেট, বিকেলে ভিডিও কনফারেন্সে নির্দেশ দিচ্ছেন আবারও “রাজনৈতিক দমন-পীড়ন” চালাতে! কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে একজন কর্মকর্তা, যে জানেন এই পথে প্রথমে প্রাণ যাবে কনস্টেবল ভাইদের, কিন্তু তবুও তিনি নিজের এক্সটেনশন বাঁচাতে পুরো বাহিনীকে ঠেলে দিচ্ছেন অন্ধকারে!
তিনি জানেন—আমাদের অনেকেই বছরের পর বছর প্রমোশন পাইনি, বঞ্চিত হয়েছি রাজনৈতিক বিবেচনায়। অথচ তিনি ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় দৌড়ে দৌড়ে ডিআইজি, অতিরিক্ত আইজিপি, তারপর আজকের এই অবস্থানে।
—
ভাইয়েরা, একটু ভেবে দেখুন—
পুলিশ কি কেবল রাজনীতির দাস? পুলিশ কি কেবল ক্ষমতাসীনদের ঢাল?
আমাদের কনস্টেবল ভাইয়েরা প্রাণ দিচ্ছেন, আর রাজনীতিকেরা নিরাপদ কক্ষে বসে নির্দেশ দিচ্ছেন।
আগামীকালের প্রোগ্রামে কি কোনো মন্ত্রী, উপদেষ্টা জিরো পয়েন্টে থাকবে? না, তারা থাকবে শীতল এসি ঘরে, আর রক্ত ঝরবে আমাদের বুক থেকে।
আমাদের দিয়ে তারা রাজনীতি রক্ষা করে, নিজেদের ক্ষমতার সিংহাসন শক্ত করে।
তারা ভুলে যায়—আমরা কেউই বেঁচে থাকার জন্য পুলিশের পোশাক পরি না, আমরা পরি দেশের জন্য, মানুষের জন্য।
—
প্রিয় সহকর্মী, একবার বিবেককে প্রশ্ন করুন—
আজ যদি আপনাকে বলা হয়, “এই প্রোগ্রাম বন্ধ করে দাও,”
তাহলে ভাবুন—জুলাই-আগস্টে যখন আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষের জান-মাল রক্ষা করছিলেন, তখন আপনার অপরাধটা কী ছিল?
আপনি আইন মানছিলেন, শপথ রক্ষা করছিলেন, অপরাধ করছিলেন না।
কিন্তু রাজনীতি যখন উল্টো পথে যায়, তখন সত্যকেও অপরাধ বানিয়ে ফেলা হয়।
আজ আপনি অন্যায় আদেশ পালন করলে, ৫, ১০ বা ২০ বছর পর—যখন ক্ষমতার পালা ঘুরবে—তখন সেই আদেশের দায় কার কাঁধে চাপবে?
তখন কোর্টে, ট্রাইব্যুনালে, গণমাধ্যমে দোষারোপ হবে আপনার নামেই।
আপনাকেই অভিযুক্ত করা হবে, আপনার পরিবারকেই লজ্জার মুখে পড়তে হবে।
মনে রাখবেন—আইজিপি, কমিশনার, মন্ত্রী, উপদেষ্টারা তখন বিদেশে চলে যাবে।
কিন্তু আমাদের পরিবার থাকবে এই মাটিতেই, এই দেশের মায়ের কোলে।
—
ভাইয়েরা, আমি বলছি না আদেশ অমান্য করো, আমি বলছি—অবৈধ আদেশ অমান্য করো।
চাকরি হারানো জীবনের শেষ নয়।
বেঁচে থাকলে চাকরি ফিরে আসবে, সম্মান ফিরে আসবে।
কিন্তু বিবেক হারালে, আত্মসম্মান হারালে—সেটা কোনোদিন ফিরে আসে না।
যারা আমাদের ভাইদের ঝুলিয়ে রেখেছিল, যারা তাদের লাশের খোঁজও নেয়নি,
তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কি আপনি আবার নিজের জীবন বাজি রাখবেন?
একবার নিজের মা-বাবার চোখে তাকান, স্ত্রীর কণ্ঠ শুনুন, সন্তানের মুখে প্রশ্ন শুনুন—
“বাবা, তুমি কার জন্য জীবন দিচ্ছ?”
ভাইয়েরা—
আমরা এই দেশকে ভালোবাসি। এই মাটি আমাদের, এই পতাকা আমাদের।
আমরা পুলিশ—দেশের শত্রু নই, আমরা জনতার বন্ধু।
তাই নিজেকে রাজনীতির যন্ত্র নয়, জাতির রক্ষক হিসেবে প্রমাণ করুন।
যেন আগামী প্রজন্ম গর্ব করে বলতে পারে—
“আমার বাবা ছিলেন একজন সত্যিকারের পুলিশ, যিনি অন্যায়ের আদেশ মানেননি।”
আল্লাহ আপনাদের রক্ষা করুন।
আপনারা সবাই নিরাপদে থাকুন, দৃঢ় থাকুন, আর বিবেকের পথে থাকুন।
স্নেহ ও শ্রদ্ধাসহ,
—একজন সহকর্মী পুলিশ কর্মকর্তা