দিনপত্র ডেস্ক :: বাঙালির রাজনৈতিক অস্তিত্ব এবং লাল সবুজের মানচিত্রের ভ্রূণ যেখানে প্রোথিত, সেই আলোকবর্তিকার নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে যখন এই দলটির জন্ম হয়, তখন এর নামকরণ করা হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে মূলমন্ত্র করে মুসলিম শব্দটি বর্জন করার মাধ্যমে এটি বাঙালির প্রাণের সংগঠনে পরিণত হয়। পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ ২৩ বছরের শৃঙ্খল ভাঙার প্রতিটি সোপানে আওয়ামী লীগ ছিল নেতৃত্বের অগ্রভাগে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট জয়, ৬৬ এর মুক্তির সনদ ছয় দফা, ৬৯ এর প্রলয়ংকরী গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ মূলত একই মালার বিভিন্ন রত্ন, যার কারিগর ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ইতিহাস এই ধ্রুব সত্যকে স্বীকার করে যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে জন্ম দেয়নি, বরং আওয়ামী লীগই বাংলাদেশ নামক স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্ম দিয়েছে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে খুনি মোশতাক এবং ক্যান্টনমেন্টে বসে ক্ষমতা দখলকারী জিয়াউর রহমানের মদদে দেশবিরোধী অপশক্তি আওয়ামী লীগকে সমূলে উৎপাটন করতে চেয়েছিল, কিন্তু জনগণের হৃদয়ে শিকড় গভীরে থাকায় তারা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
বিএনপির রাজনীতির জন্মই হয়েছে গণতন্ত্রের লাশের ওপর দাঁড়িয়ে ক্যান্টনমেন্টের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিজে ক্ষমতায় টিকে থাকতে শত শত মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তাকে ফাঁসি দিয়েছেন এবং হ্যাঁ না ভোটের প্রহসন করে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রথম ধ্বংস করেছিলেন। সেই উত্তরাধিকার বহন করে বিএনপির হাত ধরে গণতন্ত্রের কফিনে প্রথম পেরেক ঠুকেছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি বানোয়াট এবং একতরফা নির্বাচনের মহড়া সাজিয়ে। জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে সেই ছিনিমিনি খেলার পরিণাম ছিল ভয়াবহ। জনরোষের মুখে মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় সেই অবৈধ সরকারের পতন ঘটেছিল। এরপর দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ৯৬ সালের সেই সরকার ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার যা পূর্ণ মেয়াদে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন শেষে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্র এবং ভোট কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে ছলে বলে কৌশলে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। এরপর শুরু হয় বিএনপির নারকীয় তাণ্ডব। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে আওয়ামী লীগের প্রায় ২৬ হাজার নেতাকর্মীকে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়। সেই অন্ধকার সময়ের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায় ছিল ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা। ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার নেশায় বিএনপি জোট সরকার বিচারপতির বয়স বাড়ানোর মতো জঘন্য কাজ করে আবারো গণতন্ত্রের কফিনে পেরেকের ঠুকে বিদায় নিয়েছিল।
সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বিএনপি ইতিপূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত এবং কলুষিত করার কারণে উচ্চ আদালত কর্তৃক সেই ব্যবস্থা অবৈধ ঘোষিত হয়। যার ফলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইন পাস হয়। এখানে স্পষ্ট যে বিএনপি নিজেই এই ব্যবস্থার কবরে মাটি দিয়েছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি দেশজুড়ে আগুন সন্ত্রাস চালিয়ে কয়েকশ নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে ২০১৪ সালে গঠিত সংসদকে পরোক্ষভাবে বৈধতা প্রদান করে। তবে তাদের অতীত অপকর্ম এবং দেশব্যাপী জনবিচ্ছিন্নতার কারণে তারা মাত্র ৬টি আসন পায় এবং জনগণের দ্বারা আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। তাদের নির্বাচিত সদস্যরা সংসদে গিয়ে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে সেই সংসদকেও চূড়ান্ত বৈধতা দিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগেও তারা একই নাশকতার ছক আঁকে। আওয়ামী লীগ বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও তারা নির্বাচনে না এসে বাসে আগুন ও নৈরাজ্য শুরু করে। সত্য এই যে বিএনপিকে কখনও নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়নি, বরং তারা পরাজয়ের ভয়ে পালিয়ে ছিল।
বিগত ১৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইস্পাতকঠিন ছিলেন। তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বাংলাদেশে একটি সামরিক ঘাঁটি করার নীল নকশা করছে। শেখ হাসিনা সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বলেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কালার রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে রেজিম পরিবর্তন ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানো হয়। এরপর ধ্বংস করা হয়েছে বাঙালির তীর্থস্থান ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে শুরু হয় ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী ও ভাতৃপ্রতীম সংগঠনের শত শত নেতাকর্মীকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে ও কুপিয়ে গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। শত শত পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে ওভার ব্রিজের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং অত্যন্ত নির্মমভাবে জবাই করা হয়েছে। ছাত্রলীগের কর্মীকে না পেয়ে তার মাকে হত্যার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ইতিহাসে কালো দাগ হয়ে থাকবে। সবচেয়ে ঘৃণিত অধ্যায় রচিত হয় ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। জাতির পিতার স্মৃতি বিজড়িত ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি ডক্টর ইউনুসের সহযোগী হিসেবে বুলডোজার পাঠিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন বর্তমান বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গঠিত অসাংবিধানিক ডক্টর ইউনুস সরকারের প্রধান দোসর হিসেবে বিএনপি দেশজুড়ে নৈরাজ্য চালিয়েছে।
ঐতিহাসিক এই দলটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য বিএনপি সরাসরি ইউনুস সরকারকে চিঠি দিয়েছিল এবং একই দাবিতে যমুনার সামনে জামায়াত ইসলামীর আন্দোলনের নাটক সাজানো হয়েছিল। এর ফলে একটি অবৈধ অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। বিএনপি যে বহুদলীয় গণতন্ত্রের আলাপ দীর্ঘকাল ধরে করে আসছিল, তা ওই নিষিদ্ধের চিঠির মাধ্যমেই সমাধি লাভ করেছে এবং মাঠেই মারা গিয়েছে বিএনপির বহুদলীয় গণতন্ত্রের সেই ভাঁওতাবাজি। ইউনুস সরকারের অপারেশন ডেভিল হান্ট এর নামে ৫ লাখ নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে আটক এবং কারান্তরালে অসংখ্য নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অংশগ্রহণবিহীন একতরফা সাজানো প্রহসনের নির্বাচনে বাংলাদেশ সৃষ্টিকারী আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে বাধা দেওয়া দল জামায়াতে ইসলামীকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল হতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে বিএনপি। ২০০১ সালে বিএনপি যেমন চিহ্নিত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি ও রাজাকারের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে ২০২৬ সালেও তারা সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে জামায়াতকে সাজানো সংসদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পুনর্বাসিত করেছে। যে সংসদ যুদ্ধাপরাধীদের শোক জানায়, সেখানেই গতকাল আওয়ামী লীগের ওপর অবৈধ নিষেধাজ্ঞা চাপানোকে আইনে পরিণত করেছে বিএনপি।
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে বিএনপি গণতন্ত্রকে জবাই করেছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে যে ইউনুসের ভয়ংকর ফ্যাসিজমের ১৮ মাসের শাসনামলও আওয়ামী লীগকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। যারা দেশ সৃষ্টি করেছে তাদের ওপর কাগজের কলমে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনোদিন গণমানুষের হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। বিএনপি বরাবরই আওয়ামী লীগকে এদেশের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছে এবং সেই খুনি রাজনীতির সবচেয়ে বর্বরোচিত বহিঃপ্রকাশ ছিল ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সেদিন শেখ হাসিনাকে সশরীরে নির্মূল করার যে জঘন্য নীল নকশা তারা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল, তা আজও বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। আজ যারা পুনরায় সেই একই কায়দায় একটি ঐতিহাসিক দলকে নিষিদ্ধ করার উল্লাসে মেতেছে, তারা আসলে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধ্রুব সত্য এই যে কোনো রাজনৈতিক আদর্শকে আইনি খড়গ দিয়ে সমূলে উৎপাটন করা অসম্ভব। ভবিষ্যতে গণতন্ত্র হত্যার দায়ে এবং এই অবৈধ নিষেধাজ্ঞাকে আইনে পরিণত করার প্রধান কারিগর হিসেবে বিএনপিকে যদি অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়, তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এই অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে বিএনপি কেবল আওয়ামী লীগকে নয়, বরং বাংলাদেশের জন্মসনদ এবং কোটি মানুষের ভোটাধিকারকেই অস্বীকার করেছে। তবে ষড়যন্ত্রের বালুচরে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার এই প্রাসাদ বেশিদিন টিকে থাকে না। আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের অবিনাশী শক্তি এবং গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ আজ এই জুলুমের বিরুদ্ধে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। অবৈধ নিষেধাজ্ঞার এই শৃঙ্খল ভেঙে দিয়েই বাংলাদেশের মানুষ পুনরায় গণতন্ত্রের বিজয় নিশান উড়াবে। কারণ যারা বর্তমানের চরম প্রতিকূলতায় বুক চিতিয়ে লড়ছে এবং রাজপথের লড়াইয়ে অবিচল আছে, ভবিষ্যৎ কেবল তাদেরই অধিকার। জয় হবে সত্যের এবং অবিনাশী আদর্শের।