টিসিবির ট্রাক ও দারিদ্র্য

লেখক: সুমিত বিশ্বাস
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভোর থেকেই লম্বা লাইন। হাতে বাজারের ব্যাগ, কারও কোলে শিশু, কারও ভরসা ক্রাচ। লক্ষ্য একটাই, কম দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা। রমজানকে সামনে রেখে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) ট্রাক সেল কর্মসূচি শুরু করার পর রাজধানীতে এমন দৃশ্য এখন প্রায় প্রতিদিনের।

টিসিবির নির্ধারিত প্যাকেজে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ দুই লিটার সয়াবিন তেল (প্রতি লিটার ১১৫ টাকা), দুই কেজি মসুর ডাল (প্রতি কেজি ৭০ টাকা), এক কেজি চিনি (৮০ টাকা), এক কেজি ছোলা (৬০ টাকা) ও আধা কেজি খেজুর (৮০ টাকা) কিনতে পারেন। সব মিলিয়ে খরচ ৫৫০ টাকা। একই পণ্য খোলা বাজারে কিনতে খরচ প্রায় ৯৫০ টাকা। অর্থাৎ সাশ্রয় প্রায় ৪০০ টাকা, যা অনেক পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য।

লাইনের গল্প

ধানমন্ডির এক বিক্রয়স্থলের পাশে রিকশায় বসেছিলেন ৪০ বছর বয়সী নাসির খান। বাম পা প্লাস্টারে মোড়ানো। চার মাস আগে দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যাওয়ার পর থেকে তিনি কর্মহীন। স্ত্রী মাহিনুর বেগম তিনটি বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন, মাসিক আয় ৯ হাজার টাকা। স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

নাসির বলেন, এই প্যাকেজ পেলে অন্তত কিছুটা স্বস্তি মিলবে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। পরে শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় তাদের হাতে প্যাকেজ তুলে দেওয়া হয়।

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ডাব বিক্রেতা মো. শাকিল জানান, চার ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। এ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আয় হয়নি। তবু কম দামে পণ্য পাওয়াটাই তার কাছে বড় বিষয়।

৭০ বছর বয়সী মুলকুচ বিবি আগের রাতেই বাজারের ব্যাগ গুছিয়ে রাখেন। স্বামী মারা গেছেন বহু বছর আগে। মেয়ে ও জামাইয়ের আয়ে সংসার চলে। তিনি বলেন, টিসিবির ট্রাক থেকে কিনতে না পারলে অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস বাদ দিতে হয়।

শেরেবাংলা নগরে দেখা যায়, এক বছর বয়সী শিশুকে কোলে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন মিনুয়ারা বেগম। স্বামীর একার আয়ে সংসার চলে না। তাই শিশুকে নিয়েই লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে তাকে।

মূল্যস্ফীতির চাপ

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের মাসের তুলনায় বেশি। গত কয়েক মাস ধরে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। চরম দারিদ্র্যে বসবাসকারীর হারও বাড়তে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আরও উচ্চ হারের কথা বলেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২৮ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকতে পারেন।

কর্মসূচির পরিধি ও প্রশ্ন

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি ১২ মার্চ পর্যন্ত চলবে। টিসিবি জানায়, রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০টি স্থানে এবং সারাদেশে ৪৫০টি ট্রাকের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে প্রায় ৪০০ পরিবারের জন্য পণ্য থাকে। ২০ দিনে প্রায় ৩৫ লাখ ভোক্তার কাছে ২৩ হাজার টন পণ্য পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে। তার মতে, চাহিদার তুলনায় টিসিবির বর্তমান পরিধি যথেষ্ট নয়। শিল্পাঞ্চল বা শ্রমঘন এলাকায় আলাদা ব্যবস্থার কথাও তিনি উল্লেখ করেন, যাতে শ্রমজীবীরা দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে আয় হারাতে না হয়।

এ বিষয়ে টিসিবির চেয়ারম্যান ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

রমজান সামনে। কিন্তু অনেকের কাছে প্রশ্ন একটাই, এই সাশ্রয় কতদিন? লাইনের দৈর্ঘ্য বলছে, চাহিদা কমার লক্ষণ আপাতত নেই।