মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি: গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন নিয়ে পিনাকী ভট্টাচার্যের মিথ্যাচার ফাঁস

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ মাস আগে

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি: গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন নিয়ে পিনাকী ভট্টাচার্যের মিথ্যাচার ফাঁস

উপশিরোনাম: ২০১৩ সালে একাডেমিক রেফারেন্স দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের পক্ষে যুক্তি প্রদানকারী পিনাকী ভট্টাচার্যই এখন ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন বিকৃত করে ২ হাজার নিহতের দাবি করছেন, যা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বিশেষ করে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়শই বিতর্ক সৃষ্টিকারী অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি তিনি ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর একটি প্রতিবেদনকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধে মাত্র ‘দুই হাজার’ মানুষ নিহত হওয়ার দাবি করেছেন। তবে তার এই নতুন দাবির পরপরই ২০১৩ সালে লেখা তার নিজেরই একটি ব্লগ পোস্ট সামনে এসেছে, যেখানে তিনি বিভিন্ন একাডেমিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ‘৩০ লক্ষ’ শহীদের পরিসংখ্যানকেই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছিলেন। এক দশকের ব্যবধানে তার এই নাটকীয় ও স্ববিরোধী অবস্থানকে ইতিহাস বিকৃতি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সাম্প্রতিক বিতর্ক: ‘২ হাজার অভিযোগ’ যেভাবে ‘২ হাজার নিহত’ হলো

সম্প্রতি প্রচারিত একটি ভিডিওতে পিনাকী ভট্টাচার্য ১৯৭১ সালের জুন মাসে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত সাংবাদিক উইলিয়াম ড্রামন্ডের “The missing millions” শিরোনামের একটি প্রতিবেদনের অংশবিশেষ তুলে ধরেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধে মাত্র দুই হাজার মানুষ নিহত হওয়ার কথা বলেছে।

কিন্তু মূল প্রতিবেদনটি যাচাই করে দেখা যায়, পিনাকী ভট্টাচার্যের এই দাবিটি একটি নির্লজ্জ তথ্য-বিকৃতি। প্রতিবেদনে সাংবাদিক উইলিয়াম ড্রামন্ড লিখেছেন:
“Since the third week of March… there have been about 2,000 complaints from citizens about deaths at the hands of the Pakistani Army.”

এর সঠিক অনুবাদ হলো: “মার্চের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যু নিয়ে নাগরিকদের কাছ থেকে প্রায় ২,০০০ অভিযোগ পাওয়া গেছে।”

প্রতিবেদনে স্পষ্টতই ‘২,০০০ অভিযোগ’ (2,000 complaints) লেখা হয়েছে, ‘২,০০০ নিহত’ (2,000 deaths) নয়। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে মাত্র তিন মাসের মাথায় একটি তদন্তকারী সংস্থার কাছে আসা অভিযোগের সংখ্যাকে মোট নিহতের সংখ্যা বলে প্রচার করাকে বিশ্লেষকরা “ক্লাসিক ডিসইনফরমেশন কৌশল” হিসেবে অভিহিত করেছেন। তারা বলছেন, পিনাকী ভট্টাচার্য সচেতনভাবে “complaints” শব্দটিকে এড়িয়ে গিয়ে সেটিকে “নিহত” বলে প্রচার করে তার অনুসারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।

ফিরে দেখা ২০১৩: যখন পিনাকী ছিলেন ৩০ লক্ষের পক্ষে

এই বিতর্কের মধ্যেই অধ্যাপক ফাহমিদুল হকসহ অনেকেই পিনাকী ভট্টাচার্যের পুরোনো একটি লেখা সামনে নিয়ে এসেছেন। ২০১৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর ‘সামহোয়ারইনব্লগ’-এ “মুক্তিযুদ্ধের শহীদ ৩ লক্ষ নাকি ৩০ লক্ষ? নাকি ৩ মিলিয়ন?” শিরোনামে একটি ব্লগ পোস্ট লিখেছিলেন পিনাকী। সেই লেখায় তিনি ৩০ লক্ষ শহীদের পরিসংখ্যানকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে বিভিন্ন রেফারেন্স ও যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।

সেই পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, “পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হয়েছে সে যুদ্ধ গুলোর কোনটাতেই বেসামরিক মৃত্যুর কোন নাম ধরে তালিকা নাই। এমন তালিকা এখনো করা হয়না। কারণ এটা করা সম্ভব না।”

শুধু তাই নয়, তিনি মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আর. জে. রুমেল (R. J. Rummel)-এর বিখ্যাত বই “Statistics Of Pakistan’s Democide Estimates, Calculations, And Sources”-এর উদ্ধৃতি দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের পরিসংখ্যানকে সমর্থন করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “এই ৩০ লক্ষের বিষয়টা সেখানেই আছে। এই বইটিতে শুধু বাংলাদেশ নয় ভিয়েতনাম যুদ্ধ পর্যন্ত সকল গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক যুদ্ধের পরিসংখ্যান দেয়া আছে। এবং এই বইটি একটা বিশ্বব্যাপী গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক রেফারেন্স।”

বিশ্লেষণ: স্ববিরোধিতা নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস বিকৃতি?

একই ব্যক্তির দুই সময়ের দুই সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী অবস্থান জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। ২০১৩ সালে যিনি একাডেমিক বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদের পক্ষে লড়েছেন, তিনিই আজ একটি পত্রিকার প্রতিবেদনের খণ্ডিত ও বিকৃত অংশ ব্যবহার করে সেই সংখ্যাকে দুই হাজারে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) এ বিষয়ে বলেন, “এটি শুধু স্ববিরোধিতা নয়, এটি একটি আদর্শিক ডিগবাজি। ২০১৩ সালে তিনি শাহবাগ আন্দোলনের আবহে হয়তো একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভকে সমর্থন করেছেন। আর এখন তিনি ভিন্ন একটি রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ইতিহাস তো ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তার সাম্প্রতিক দাবিটি স্রেফ মিথ্যাচার, কারণ তিনি একটি রিপোর্টের মূল শব্দকেই বদলে দিয়েছেন।”

ফ্যাক্ট-চেকাররা বলছেন, পিনাকী ভট্টাচার্যের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে অর্ধসত্য বা পুরোপুরি মিথ্যা তথ্য প্রচার করেন, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি সর্বজনীন ও সংবেদনশীল বিষয়কে বিতর্কিত করে তোলা হয়, যা বিভেদ তৈরি করে এবং জাতীয় ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, ডিজিটাল যুগে যেকোনো তথ্য গ্রহণের আগে তার মূল উৎস যাচাই করা এবং সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট বোঝা কতটা জরুরি। পিনাকী ভট্টাচার্যের এই দুই ভিন্ন সময়ের অবস্থান তার বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে চলমান অপপ্রচারের একটি অন্যতম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

পিনাকী ভট্টাচার্য (Pinaki Bhattacharya)
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ (Liberation War 1971)
ইতিহাস বিকৃতি (History Distortion)
তথ্য-বিকৃতি (Information Distortion)
দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)
ফ্যাক্ট-চেক (Fact-Check)
অপপ্রচার (Propaganda)