নিউজ ডেস্ক :: দেশের প্রশাসনিক কাঠামো আজ নৈতিক পতনের এক নতুন সংজ্ঞা রচনা করছে। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড বলে পরিচিত এই প্রশাসন এখন যেন রূপ নিয়েছে অঘোষিত নিলামঘরে। যেখানে যোগ্যতা নয়, টাকাই নিয়োগের চাবিকাঠি। ১৫ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তি যেন সেই অন্ধকার বাস্তবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
*মধ্যরাতের বিজ্ঞপ্তি, ঘুষের গুঞ্জন*
গভীর রাতে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর থেকেই প্রশাসনিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনার ঝড়। অভিযোগ উঠেছে—ডিসি পদ এখন কার্যত বিক্রিযোগ্য পণ্য।
অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, কক্সবাজারে ডিসি পদের দর উঠেছে ২৫ কোটি টাকা, চট্টগ্রামে ২০ কোটি, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জে ২০ কোটি টাকায় “লেনদেন” হয়েছে বলে দাবি। অপেক্ষাকৃত ছোট জেলা যেমন রাজবাড়ী, মেহেরপুর বা নওগাঁ—সেখানে ঘুষের অঙ্ক ৫ থেকে ১৫ কোটির মধ্যে।
এ যেন এক নতুন দরপত্র সংস্কৃতি—যেখানে প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়া মানে কোটি টাকার বিনিয়োগ, আর সেই বিনিয়োগ উদ্ধার মানেই জনগণের অর্থে হাত দেওয়া।
*ঘুষের ফর্দে প্রশাসনের চেহারা*
টিআর (টেস্ট রিলিফ) ও কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্প আজ পরিণত হয়েছে দুর্নীতির চারণভূমিতে। মাঠপর্যায়ের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতি টনে ৫০০০ টাকা ঘুষ নির্ধারিত—যা নিচ থেকে ওপরে পর্যন্ত ভাগ হয়ে যায়।
এমনকি ঢাকার ডিসি পদের দাম ৫০ কোটি টাকায় উঠেছে বলেও প্রশাসনিক মহলে গুঞ্জন চলছে। এই চক্রের পেছনে রয়েছে অদৃশ্য শক্তি—যাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এমন লেনদেন সম্ভব নয় বলে অনেকে মনে করেন।
জনগণের জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ, সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ কিংবা ত্রাণ কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রেই এখন “অংশীদারি” প্রথা। গরিবের ঘরে পৌঁছানোর কথা যে অর্থের, তা হারিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতির গোলকধাঁধায়।
*রাষ্ট্রযন্ত্রে নৈতিক দেউলিয়াত্ব*
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা শুধু দুর্নীতি নয়—রাষ্ট্রের নৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ার সতর্ক সংকেত।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব বলেন, “যে পদে জনগণের সেবা ও উন্নয়ন পরিচালনার দায়িত্ব, সেটি যখন কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।”
একসময় বাংলাদেশের প্রশাসন ছিল দক্ষতা, সততা ও শৃঙ্খলার প্রতীক। কিন্তু আজ সেটিই অর্থলোভের প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে উন্নয়ন নয়, দুর্নীতি-নির্ভর প্রশাসনই হবে দেশের নিয়তি।
*প্রশাসন নিলামঘরে—সুশাসন কফিনে*
আজ সাধারণ মানুষ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক ভয়াবহ বার্তা—“টাকা দাও, পদ নাও।”
এই বাস্তবতা শুধু অনৈতিক নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক গভীর বিশ্বাসঘাতকতা। প্রশাসনের এই ক্রমাবনতি যেন সুশাসনের কফিনে শেষ পেরেক।
বাংলাদেশ একসময় দুর্নীতিতে “বিশ্বচ্যাম্পিয়ন” ছিল। এখন সেই পুরোনো অধ্যায় যেন ফিরে আসছে নতুন আঙ্গিকে। যদি এখনই লাগাম টানা না হয়, প্রশাসনের মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়বে—আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ জনগণই।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ও বদলিকৃত জেলা প্রশাসকগণ
সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ১৫ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক পদায়ন করা হয়েছে। বদলিকৃতদের মধ্যে রয়েছেন—
বাগেরহাটের ডিসি আহমেদ কামরুল হাসান → নোয়াখালী,
কুষ্টিয়ার ডিসি আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন → হবিগঞ্জ,
ভোলার ডিসি মো. আজাদ জাহান → গাজীপুর,
বরগুনার ডিসি মো. শফিউল আলম → ঢাকা,
সিরাজগঞ্জের ডিসি মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম → গাইবান্ধা,
খুলনার ডিসি মো. তৌফিকুর রহমান → বগুড়া।
অন্যদিকে নতুনভাবে পদায়িত হয়েছেন—
সিলেট জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী সন্দ্বীপ কুমার সিংহ (বরগুনা),
কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সচিব মো. আমিনুল ইসলাম (সিরাজগঞ্জ),
বাণিজ্য উপদেষ্টার একান্ত সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ (মাগুরা),
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবু সাঈদ (পিরোজপুর),
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মিজ আফরোজা আখতার (সাতক্ষীরা),
ফেনীর উপপরিচালক গোলাম মো. বাতেন (বাগেরহাট),
প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব স. ম. জামশেদ খোন্দকার (খুলনা),
রাজউকের পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন (কুষ্টিয়া),
এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব ডা. শামীম রহমান (ভোলা)।
ডিসি পদে কোটি টাকার বাণিজ্য কেবল নিয়োগ দুর্নীতি নয়—এটি রাষ্ট্রের নৈতিক মৃত্যুঘণ্টা।
যদি এই নিলাম সংস্কৃতি থামানো না যায়, তবে ভবিষ্যতের ইতিহাস একদিন লিখবে—
“প্রশাসন ছিল জনগণের জন্য, আর শেষ পর্যন্ত বিক্রি হলো টাকার জন্য।”