পদোন্নতির রমরমা বাণিজ্য, সচিবের চেয়ার পেতে কোটি টাকার দৌড়ঝাঁপ

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের প্রশাসনব্যবস্থায় “পদোন্নতি” এখন শুধু কর্মদক্ষতা বা জ্যেষ্ঠতার বিষয় নয় এটি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে এক প্রকার অঘোষিত বাণিজ্যে। শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে চলছে প্রভাব, তদবির ও অর্থের বিনিময়ে পদপ্রাপ্তির অভিযোগ। একাধিক সূত্রের তথ্য ও নথি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর চিত্র প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে, যারা রাজনৈতিক ও আর্থিক শক্তি ব্যবহার করে নিয়োগ ও বদলির বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। উপদেষ্টারা বদলী বানিজ্যে সরাসরি জড়িত।

*চেয়ার পেতে টাকার খেলা*

জনপ্রশাসন, অর্থ, বাণিজ্য, ও রাজস্ব–সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদে পদোন্নতি পেতে কর্মকর্তাদের বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে এমন অভিযোগ একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে পাওয়া গেছে। সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সচিব পর্যায়ের একটি পদোন্নতি ঘিরে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেনের আলোচনা প্রশাসনজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“বর্তমানে প্রশাসনে পদোন্নতি পেতে যোগ্যতার চেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ‘পৃষ্ঠপোষকতা’। কিছু ব্যক্তি ও দালাল চক্র শীর্ষ পদগুলোকে ব্যবহার করছে লাভজনক ‘অবস্থান’ হিসেবে।”

অভিযোগ রয়েছে, এ ধরনের প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদোন্নতি ও বদলির তালিকা তৈরির আগেই নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নাম চূড়ান্ত করা হয়। পরবর্তীতে সেই নিয়োগকে “প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত” হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়।

*অভ্যন্তরীণ চক্রের নেটওয়ার্ক*

তদন্তে জানা যায়, এই অনৈতিক লেনদেনের নেপথ্যে জড়িত একাধিক প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী মহল। তারা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও দাতা সংস্থার আড়ালে যোগাযোগ স্থাপন করে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে অবস্থানরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক, “নিয়োগ–সহায়তা” চুক্তি এবং নথিপত্র প্রস্তুতের মতো কার্যক্রমও চলে গোপনে।

একজন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব বলেন,
অনেকে বিশ্বাস করেন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলে আজ আর সচিব হওয়া সম্ভব নয়। এটাই এখন প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দুঃখ।”

*প্রভাবশালী মহলের ছায়া*

নিয়োগ ও পদোন্নতির এই তথাকথিত “বাণিজ্য” পরিচালনায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুই প্রভাবশালী স্তর সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ। তাদের একজন দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা পর্যায়ের প্রভাব কাজে লাগান, অন্যরা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও প্রবাসী অর্থের সঙ্গে সংযোগ রাখেন। একাধিক সূত্র জানায়, এই নেটওয়ার্কই এখন সচিব, অতিরিক্ত সচিব, এমনকি প্রকল্প পরিচালক পর্যায়ের পদ নিয়ন্ত্রণ করছে।

*প্রশাসনে নৈতিক সঙ্কট*

প্রশাসন বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি এই অনৈতিক লেনদেন সত্য হয়, তবে এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য ভয়াবহ সংকেত। যোগ্য কর্মকর্তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, ফলে প্রশাসনের মনোবল ভেঙে পড়ছে। এতে সেবা খাতে গাফিলতি বাড়ছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে এবং দুর্নীতি দিন দিন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।

*অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভাষায়,*
“পদোন্নতির বাজার তৈরি মানে হচ্ছে রাষ্ট্রের সততা ও দক্ষতার ভিত্তি ভেঙে ফেলা। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রশাসন একদিন কিছু গোষ্ঠীর সম্পত্তিতে পরিণত হবে।”

*স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি*

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশাসনে স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া ও সম্পদ যাচাই–ব্যবস্থা চালুর দাবি তুলেছেন। তাদের মতে, পদোন্নতির প্রক্রিয়া উন্মুক্ত করা, কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণ প্রকাশ, এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনই হতে পারে এই “সিন্ডিকেটবিরোধী” প্রথম পদক্ষেপ।

একজন বিশ্লেষক বলেন,

প্রশাসনের পদোন্নতি যদি অর্থের লেনদেনে নির্ভরশীল হয়, তবে সেটি আর রাষ্ট্রের সেবা নয় বরং প্রভাবের বাজার। এখন সময় এসেছে এর মূল শিকড় খুঁজে বের করার।”

বাংলাদেশের প্রশাসন একসময় ছিল নিরপেক্ষতা, দক্ষতা ও সততার প্রতীক। কিন্তু আজ সেই কাঠামো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে অর্থের প্রভাব ও অনৈতিক লেনদেনের কারণে। পদোন্নতির এই রমরমা বাণিজ্য রোধে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রশাসন হয়ে পড়বে আস্থাহীন ও দুর্নীতিগ্রস্ত যার বোঝা বইতে হবে গোটা জাতিকে।