দিনপত্র ডেস্ক :: বাংলাদেশে জীবনরক্ষাকারী টিকার সম্ভাব্য সংকট এবং এর ফলে উদ্ভূত জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটির এই সাম্প্রতিক বক্তব্য দেশের স্বাস্থ্য খাতের নীতিগত ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতাকে নতুন করে খবরের শিরোনামে নিয়ে এসেছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানিয়েছেন, টিকার ঘাটতি রোধে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে আগেভাগেই সতর্ক করা হয়েছিল।
”মহামারি রাতারাতি ঘটে না”
রানা ফ্লাওয়ার্সের এই বক্তব্য স্বাস্থ্য খাতের আগাম প্রস্তুতি এবং মহামারি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেন:
”কোনো মহামারি রাতারাতি ঘটে না। কিছু বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ রকম পরিস্থিতি দেখা দেয়। বিশেষ করে, টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে।”
কাঠামোগত দুর্বলতা নাকি সমন্বয়ের অভাব?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, যেকোনো দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি (EPI) একটি চলমান ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থার মধ্যে প্রশাসনিক স্থবিরতা কিংবা সিদ্ধান্তহীনতার কারণে যদি এই টিকা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তবে তার চড়া মূল্য দিতে হবে দেশের সাধারণ জনগণকে।
ইউনিসেফের পক্ষ থেকে একাধিকবার লিখিতভাবে সতর্ক করার পরও কেন সময়মতো কার্যকর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছেন।
সংস্কারের চ্যালেঞ্জ বনাম জনস্বাস্থ্য রক্ষা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে রাষ্ট্র সংস্কার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার মতো নানামুখী জটিল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্যের মতো অতি সংবেদনশীল খাতকে কোনোভাবেই উপেক্ষা বা ধীরগতির করার সুযোগ নেই। টিকার মতো জীবনরক্ষাকারী উপাদানের সংকট কেবল বর্তমান প্রজন্মের শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকেই ঝুঁকিতে ফেলবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য সূচককেও অনেক পিছিয়ে দেবে।
ভবিষ্যৎ করণীয়: ব্লেম-গেম নয়, প্রয়োজন দ্রুত সমন্বয়
একটি নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউনিসেফের এই সতর্কতা কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার একটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও দায়িত্বশীল সতর্কীকরণ প্রক্রিয়া। তবে এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক মহলে যে নানা ধরনের মেরুকরণ এবং সরকারের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেষ্টা চলছে, তা-ও স্পষ্ট।
জরুরি ভিত্তিতে যা করা প্রয়োজন:
রাজনৈতিক ব্লেম-গেম বন্ধ করা: বর্তমান প্রশাসনের উচিত বিষয়টিকে রাজনৈতিক দোষারোপের জায়গা থেকে না দেখে একটি জরুরি স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে বিবেচনা করা।
সরাসরি সমন্বয়: ইউনিসেফ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার সাথে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সমন্বয় সাধন করা।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন: আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য দ্রুত দূর করে টিকার সরবরাহ লাইনে গতি আনা।
ভবিষ্যতে যেন কোনো প্রতিরোধযোগ্য রোগ মহামারির রূপ নিতে না পারে, সেজন্য টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক করাই এই মুহূর্তে সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।