চাল নিয়ে চালবাজি : বাংলাদেশ সরকারের ‘বিষাক্ত’ পাকিস্তান প্রেম বনাম জনস্বাস্থ্য

লেখক: আল হাবিবুর,
প্রকাশ: ৭ ঘন্টা আগে

দিনপত্র ডেস্ক :: দুই হাজার চল্লিশ কোটি টাকা দিয়ে যে চাল কেনা হচ্ছে, সেই চালান নিয়ে ইউরোপ যা করেছে, বাংলাদেশ সরকার কেন সেটা করলো না, এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ল্যাবে পাকিস্তানি চালে ট্রাইসাইক্লাজল, ক্লোথিয়ানিডিনের মতো কীটনাশক আর অ্যাফলাটক্সিনের মতো ছত্রাকজাত বিষ পাওয়া গেছে, তাই চালান ফেরত গেছে। অথচ সেই একই দেশের একই ধরনের চাল ঢাকায় ঢুকছে কোনো স্বতন্ত্র পরীক্ষাগারের সিলমোহর ছাড়াই, শুধু কাগজে-কলমে একটা আমদানি চুক্তির জোরে। এটা কাকতালীয় মনে হয় না, কারণ গত এক বছরে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের মধ্যে যা ঘটেছে, তার একটা প্যাটার্ন আছে।

পনেরো বছরের কূটনৈতিক নীরবতা ভেঙে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে গত বছরের এপ্রিলে। চৌদ্দ বছর পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে জানুয়ারিতে। একই মাসে পাকিস্তান ঘোষণা দিয়েছে, তারা চীনের সাথে যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করবে। তার আগের বছরের জুনে কুনমিংয়ে পাকিস্তান-চীন-বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে বসেছে। এই সময়টায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক লক্ষণীয়ভাবে উন্নত হয়েছে, দুই দেশের মধ্যে সিনিয়র রাজনৈতিক আর সামরিক পর্যায়ের সফর বিনিময় হয়েছে। এটা একটা সুস্পষ্ট কূটনৈতিক পুনর্মিলনের অংশ।

আর এই পুনর্মিলনের রাজনৈতিক শেকড় নতুন কিছু না। খালেদা জিয়ার আমলে বিএনপি দেশে-বিদেশে পাকিস্তান-ঘেঁষা অবস্থান গড়ে তুলেছিল, একই সাথে চীনের সাথেও কৌশলগত সম্পর্ক বাড়িয়েছিল, আর ভারতীয় উদ্যোগকে আধিপত্যবাদী বলে আখ্যা দিয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত-পাকিস্তান-চীনের এই যোগসূত্র নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ বহুদিনের। অর্থাৎ আজকের এই “পাকিস্তান প্রীতি” কোনো নতুন নীতি না, এটা পুরনো এক রাজনৈতিক অক্ষের পুনরুজ্জীবন মাত্র। জিয়াউর রহমানের আমল থেকেই পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠতা বিএনপির চরিত্রের অংশ, মোশতাকের ধারাবাহিকতায় জিয়ার সরকার পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছিল।

জামায়াতের গল্পটা আরও পুরনো, আরও গভীর। ইতিহাস কারো মুখাপেক্ষী না, একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল জামায়াত, মুক্তিযুদ্ধের পর দলটি নিষিদ্ধ হয়েছিল, পরে ঊনিশশো উনআশিতে বিএনপি সরকারই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। যে দল স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরও সেই দলের রাজনৈতিক-আদর্শিক টান পাকিস্তানের দিকে থাকাটা আশ্চর্যের কিছু না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আজকের বাংলাদেশে এই টানকে “স্বাভাবিক কূটনীতি” বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই যে সরকার পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক পুনর্জীবিত করতে এত ব্যস্ত, যুদ্ধবিমান কিনছে, ফ্লাইট চালু করছে, ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে বসছে – সেই একই সরকার কি ঠিক এই কারণেই পাকিস্তান থেকে আসা একটা রাসায়নিক-দূষিত চালের চালানকে বাড়তি স্ক্রুটিনি ছাড়া ছেড়ে দিলো? সম্পর্ক খারাপ করার ভয়ে? নাকি নিছক অবহেলা? কোনটাই গ্রহণযোগ্য জবাব না, কারণ দুটোরই মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের শরীরকে, যাদের প্রতিদিনের ভাতের থালায় এই চাল যাচ্ছে।

আর যে মানুষটা এই সরকারের নেতৃত্বে, তার নিজের ইতিহাসও প্রশ্নমুক্ত না। খালেদা জিয়ার আমলে হাওয়া ভবনকে রাষ্ট্রের সমান্তরাল ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ, দুর্নীতি আর অর্থ পাচারের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে তারেক রহমানের সাথে জড়িয়ে আছে। উইকিলিকসে প্রকাশিত মার্কিন দূতাবাসের একটি বার্তায় তাকে দুর্নীতিপ্রবণ শাসনের প্রতীক বলে বর্ণনা করা হয়েছিল, আর সমালোচকদের কাছে তিনি এখনো “খাম্বা তারেক” নামে পরিচিত। যে মানুষটার প্রশাসনিক ইতিহাসেই স্বচ্ছতার প্রশ্ন আছে, তার সরকারের কাছে খাদ্য আমদানির মতো স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তে বাড়তি স্বচ্ছতা দাবি করাটা অন্যায্য কিছু না।

দলীয় পর্যায়েও ছবিটা খুব একটা ভিন্ন না। বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে বারবার চাঁদাবাজি আর সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে, এমনকি ছাত্র-যুব সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি প্রকাশ্য দিবালোকের হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে সম্প্রতি, যা জনমনে দলটির প্রতি অসন্তোষ আরও গভীর করেছে। যে দল নিজের মাঠপর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ, সেই দলের কাছে জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে জবাবদিহিতা আশা করাটা আশাবাদই থেকে যায়।

সরকার হয়তো বলবে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে সস্তায় চাল দরকার ছিল। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা না, কিন্তু অজুহাত হিসেবে দুর্বল। সস্তা চাল আর নিরাপদ চাল এক জিনিস না। আর যে সরকার একদিকে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধবিমান কেনাবেচার মতো বড় অঙ্কের কৌশলগত চুক্তি করতে পারে, সেই সরকারের পক্ষে পঞ্চাশ হাজার টন চালের একটা স্বাধীন রাসায়নিক পরীক্ষা করানো কোনো বড় ব্যাপার হওয়ার কথা না। এটা সামর্থ্যের প্রশ্ন না, অগ্রাধিকারের প্রশ্ন।

শেষ পর্যন্ত এই পুরো ঘটনাটা একটা জিনিস স্পষ্ট করে দেয়, ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনটা বদলায়নি। যে জোট এক সময় পাকিস্তানের সাথে রাজনৈতিক-আদর্শিক সখ্যতার জন্য সমালোচিত হয়েছিল, আজ সেই একই সখ্যতার বাস্তব মূল্য গুনতে হচ্ছে দেশের সাধারণ ভোক্তাকে, প্লেটে থাকা প্রতি দানা চালের মধ্য দিয়ে। প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়, এই সরকারের কাছে অগ্রাধিকার আসলে কী, মানুষের স্বাস্থ্য, নাকি ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্কের সমীকরণ?