দিনপত্র ডেস্ক :: বিশ্ব রাজনীতিতে যে কজন রাষ্ট্রনেতা মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বদেশ রক্ষায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন, শেখ হাসিনা তাঁদের অন্যতম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে ফিদেল কাস্ত্রোর মতো রাষ্ট্রনৈতিক দার্শনিকের কাতারে ফেললে ভুল হবে না। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গেও তাঁর লড়াইয়ের মিল রয়েছে। তাঁদের এই লড়াইয়ের মূল ভিত্তি হল দেশ, দেশের মানুষ এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, মর্যাদা ও অগ্রযাত্রার মূল ভিত্তি হল তার সার্বভৌমত্ব। সার্বভৌমত্ব ছাড়া কোনও রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কল্পনা করা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বহির্বিশ্বের চাপ ও হস্তক্ষেপের মুখে মাথা নত না করার নজির কেবল আওয়ামী লীগেরই রয়েছে। দলটির দৃঢ় নেতৃত্ব ও জনসম্পৃক্ততার ঐতিহাসিকতাই একে বৈপ্লবিক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে অদ্যাবধি ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই দলকে ইতিহাস একদিন যথাযথ মূল্যায়ন করবে।
অতি সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আপোষহীন নেতৃত্ব এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে তিনি ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ও পুঁজিবাদী পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে লড়াই করেছেন। মার্কিন রেজিম চেঞ্জের রাজনীতির শিকার হওয়ার পরেও তিনি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে মাথা নত না করার যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা রাজনীতি সচেতন মানুষদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বের এটি এক অনন্য গুণ।
বিশ্ব রাজনীতিতে যে কজন রাষ্ট্রনেতা মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বদেশ রক্ষায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন, শেখ হাসিনা তাঁদের অন্যতম। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁকে ফিদেল কাস্ত্রোর মতো রাষ্ট্রনৈতিক দার্শনিকের কাতারে ফেললে ভুল হবে না। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গেও তাঁর লড়াইয়ের মিল রয়েছে। তাঁদের এই লড়াইয়ের মূল ভিত্তি হল দেশ, দেশের মানুষ এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই পররাষ্ট্রনীতিকে ধারণ করে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছেন। বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার ও সার্বভৌমত্বের চেতনা তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে। এর ব্যতিক্রম তিনি হননি।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার। তিনি সেই প্রতিজ্ঞা মেনেই এগিয়ে চলেছেন। বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকরের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার সার্বভৌমত্বে তিনি কোনও বিদেশি চাপ বরদাস্ত করেন না। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় একাত্তর-বিরোধী শক্তি যে ষড়যন্ত্র করেছিল, তিনি তা প্রতিহত করতে সচেষ্ট ছিলেন।
কোনও দেশের সার্বভৌমত্ব কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাও এর অন্যতম অংশ। বিশ্বব্যাংক যখন ড. ইউনূসের প্ররোচনায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন প্রত্যাহার করে নেয়, তখন শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও আপোষ করেননি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা ও বাস্তবায়ন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে বিশ্বমঞ্চে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। এটি প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশ উন্নয়ন সহযোগীদের অন্যায় শর্তের কাছে মাথা নত করে না।
একই কথা খাটে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করার পর মার্কিন বলয় থেকে রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছিল। সেই অভিযোগ ধোপে টেকেনি। প্রকল্পটিতে ঋণদাতা দেশ রাশিয়াও এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল। তথাকথিত পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন এই প্রকল্পের বিরোধিতা করে এসেছে, যা ছিল মার্কিন স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা। কারণ, এসব পরিবেশবাদী এনজিও মার্কিন তহবিলের মাধ্যমেই সংগঠিত হয়। শেখ হাসিনা বিষয়টি ধরতে পেরেছিলেন এবং সাম্রাজ্যবাদীদের কাছে মাথা নত করেননি।
ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব ও সীমানা সমস্যার সমাধানে শেখ হাসিনার দূরদর্শী কূটনৈতিক দক্ষতা প্রমাণিত হয়েছে ভারতের সঙ্গে চার দশকের পুরনো স্থল সীমানা চুক্তি (LBA) বাস্তবায়ন ও ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের মাধ্যমে। এর ফলে কোনও যুদ্ধ বা রক্তপাত ছাড়াই বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডগত অধিকার বুঝে পেয়েছে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ‘তিস্তা ইস্যু’ নিয়েও তিনি সরব ছিলেন। জল সমস্যা সমাধানের আলোচনা চালু রেখেই বিকল্প ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। চীনের সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টাও তাঁর সার্বভৌমত্ববাদী স্বাধীন চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। এর মধ্য দিয়ে ‘শেখ হাসিনা ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করেছেন’—এন্টি-আওয়ামী গোষ্ঠীর এই প্রচারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
মায়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা জয়ের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা সমুদ্র সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনেও শেখ হাসিনার ভূমিকা অনস্বীকার্য। এতো কিছুর পরেও শেখ হাসিনাকে ছোট করার যে প্রবণতা দেখা যায়, তা মূলত বাংলাদেশ-বিরোধী মহলের অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্রেরই ইঙ্গিত।
বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সবসময়ই পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে ছিল। এই টানাপোড়েন এখন তুঙ্গে। শেখ হাসিনা দীর্ঘ শাসনকালে কোনও নির্দিষ্ট পরাশক্তির খপ্পরে না পড়ে সুষম ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রেখেছিলেন। জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা আপোষহীন ছিলেন। মায়ানমার থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনা বিশ্বমঞ্চে ‘মানবিকতার মা’ হিসেবে ভূষিত হয়েছিলেন। তবে এই মানবিকতার পাশাপাশি তিনি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও ছাড় দেননি। শরণার্থীদের সসম্মানে প্রত্যাবর্তনের দাবিতে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়।
সেন্টমার্টিন ও বঙ্গোপসাগর প্রসঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে তাঁর আপোষহীন মনোভাব সর্বজনবিদিত। বঙ্গবন্ধু যেমন স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ভূখণ্ডকে মার্কিনীদের হাতে তুলে দেননি, তেমনি তাঁর কন্যাও তা করেননি। এই আপোষহীনতার কারণেই পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা উৎখাতের শিকার হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমানের সরকার সেন্টমার্টিন আমেরিকাকে দিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের পরেই ড. ইউনূস সেই চুক্তি পুনরায় বলবৎ করেছেন। এন্টি-আওয়ামী জোট বাণিজ্যিক চুক্তিসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও সেন্টমার্টিনে আমেরিকা এখন থিতু হতে প্রস্তুত। আজ শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে। এর মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে, একাত্তর-বিরোধী শক্তিগুলো মূলত বাংলাদেশ-বিরোধী।
শেখ হাসিনা জানতেন, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা অপরিহার্য। তিনি ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ প্রণয়ন করে সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সাবমেরিন সংযোজন, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ক্রয়ের মাধ্যমে তিনি সামরিক বাহিনীকে স্বনির্ভর করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আজ সেই উদ্যোগ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবলে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিতর্কিত ভূমিকার কারণে শেখ হাসিনার সরকার পতনের মধ্য দিয়ে সেই উদ্যোগ থমকে গিয়েছে। বিপরীতে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো রক্তখেকো ও ক্ষমতালিপ্সু সেনাবাহিনীর আদলে গড়ে ওঠার চেষ্টা করছে। তারা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর ভারসাম্য নষ্ট করেছে এবং নিরাপত্তাকে নড়বড়ে করেছে। এর সুযোগ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো অযাচিত দাদাগিরি শুরু করেছে। সেই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে আলোচিত ইসলামী সন্ত্রাসবাদীরাও এই দেশে ভিড়েছে। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও উদ্বেগজনক। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় শেখ হাসিনা যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা আজ আর নেই। ফলে দেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ বেড়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তাকে নাজুক পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন।
একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক নানা সমীকরণ ও চাপের মুখেও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। শেখ হাসিনা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও আপোষহীন মনোভাবের মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ জয় করেছিলেন। তাঁর এই দৃঢ় অবস্থান বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে এক আত্মমর্যাদাশীল ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু সব অর্জন আজ ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তিগুলো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করে চীন, পাকিস্তান ও আমেরিকার ‘হাব’ হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
এই নব্য ঔপনিবেশিক প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রয়োজন। তিনি ছাড়া বাংলাদেশ রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্র সুরক্ষায় আত্মভোলা এই জাতিকে পথ দেখাতে শেখ হাসিনাকেই এগিয়ে আসতে হবে। এমন যুগসন্ধিক্ষণে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের বিকল্প নেই। শেখ হাসিনার বিকল্প হিসেবে ‘শেখ হাসিনাকেই’ বাংলাদেশে ফিরতে হবে—এটিই এখন সময়ের দাবি।